এখন গ্রামেও করোনা সংক্রমণ বাড়ছে

নিউজ ডেস্ক আপডেট:১৮ জুন, ২০২১ এখন গ্রামেও করোনা সংক্রমণ বাড়ছে

পলিথিনে ঢাকা সারি সারি নতুন কবর। হঠাৎ দেখলে গণকবর বলে ভ্রম হতে পারে। কবরগুলো রাজশাহীর গোদাগাড়ীর মহিশালবাড়ী কবরস্থানের। সেখানকার তত্ত্বাবধায়ক মমতাজ উদ্দিন বললেন, ১৮ বছরের চাকরিজীবনে এত নতুন কবর তিনি দেখেননি। এর দেড় কিলোমিটার দূরে গোদাগাড়ী কেন্দ্রীয় কবরস্থান। সেখানেও নতুন কবরের সারি।

মহিশালবাড়ী কবরস্থানে গত দেড় মাসে কবর হয়েছে ৪০টি। আর গোদাগাড়ী কেন্দ্রীয় কবরস্থানে গত এক মাসেই ৩৮টি কবর হয়েছে। কবরস্থান কমিটির ভাষ্য, ৪০ জনের ২১ জন আর ৩৮ জনের মধ্যে ২৪ জন করোনা বা করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন।

রাজশাহীর গোদাগাড়ীর এই চিত্র বলছে, শহরের পাশাপাশি করোনায় সংক্রমণ ও মৃত্যু এখন গ্রামাঞ্চলেও বেড়ে চলেছে। রাজশাহী ছাড়াও ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ ও খুলনা জেলার গ্রামাঞ্চলেও করোনার বিস্তৃতি বেড়ে গেছে। অনেক উপজেলায় সর্দি-কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত রোগী আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। কিন্তু সামাজিক বিড়ম্বনার ভয়ে উপসর্গ থাকার পরও অনেকে করোনা পরীক্ষা করতে চান না। শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও মাস্ক ব্যবহারেও উদাসীনতা দেখা যায়। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এ প্রবণতাকে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বলছেন। তাঁরা উপজেলা পর্যায়ে অক্সিজেন সরবরাহ, অক্সিজেন মাস্ক, হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা সরবরাহ করাসহ চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক পরামর্শক মুজাহেরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, সংক্রমণের শৃঙ্খল ভেঙে দিতে না পারায় এমন পরিস্থিতি ঘটেছে। সীমান্তের উপজেলা ও জেলাগুলোতে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং এবং অ্যান্টিজেন টেস্ট বাড়াতে হবে।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাস সংক্রমিত হয়ে ৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় করোনা শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ৮৪০ জনের।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলছেন, দুই-তিন সপ্তাহ ধরে এ হাসপাতালে যেসব রোগী করোনা ও করোনার উপসর্গ নিয়ে আসছেন, তাঁদের বেশির ভাগই শ্রমজীবী। জেলা সিভিল সার্জনের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ মে পর্যন্ত জেলার ৯ উপজেলায় মোট শনাক্ত করোনা রোগী ছিল ১ হাজার ৫৭৬ জন। মৃত্যু ছিল ২৭ জনের। শনাক্তের বিপরীতে মৃত্যুর হার ছিল ১ দশমিক ৭১ শতাংশ। আর ১ জুন থেকে গতকাল পর্যন্ত এই ৯ উপজেলায় শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৫৬ জন। মৃত্যু হয়েছে ৪৬ জনের। মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, গ্রামপর্যায়ের শ্রমজীবী মানুষ এবার বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। মারাও যাচ্ছেন। গ্রামের মানুষের নমুনা পরীক্ষায় আগ্রহ কম।

সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা শহরের চেয়ে উপজেলাগুলোতে করোনায় মৃত্যু বেশি দেখা যাচ্ছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি জুন মাসের প্রথম ১৬ দিনে নগর ও জেলা মিলিয়ে করোনা শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৮১৮ জনের। এর মধ্যে নগরে শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৩৪৬ জনের আর ৯টি উপজেলায় শনাক্ত হয়েছে ৪৭২ জনের। এই হিসাবে জুনের ১৬ দিনে জেলার মোট শনাক্তের প্রায় ৭৪ শতাংশ নগরের এবং ২৬ শতাংশ উপজেলার রোগী। এই সময়ে জেলায় করোনায় সংক্রমিত হয়ে মারা যাওয়া ২৩ জনের মধ্যে নগরের ১১ জন এবং বিভিন্ন উপজেলার ১২ জন রয়েছেন।

তেরখাদা উপজেলায় সংক্রমণ বাড়ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আগের চেয়ে শনাক্ত অনেকে বেড়েছে। জ্বর ও সর্দি-কাশি নিয়ে আগের চেয়ে বেশি মানুষ হাসপাতালে আসছেন।

খুলনার সিভিল সার্জন নিয়াজ মোহাম্মদ বলেন, উপজেলাগুলোতে গত মাসের শেষ দিক থেকে চলতি মাসজুড়ে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। পারিবারিক-সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ বেড়ে গেছে। স্বাস্থ্যবিধির বিষয়েও উদাসীনতা চোখে পড়ার মতো, এসব কারণেই গ্রামে সংক্রমণ পরিস্থিতি ঊর্ধ্বমুখী।

Source: www.prothomalo.com