আল -কুরআন শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

আল -কুরআন শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

আল্লাহ তাআলা এই পৃথিবীতে বিশ্ব মানবতাকে সঠিক পথের সন্ধান দেওয়ার জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। এসকল নবী-রাসূলদেরকে গাইডবুক হিসেবে সহীফা ও কিতাব দিয়েছেন। এসব কিতাব সমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ কিতাব হচ্ছে আল -কুরআন। পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের উপরে ঈমান আনা এবং আল -কুরআনকে মেনে চলা মুসলিমদের উপরে আল্লাহ তাআলা ফরজ করেছেন। আল -কুরআন এসেছে বিশ্ব মানবতাকে হিদায়াতের সঠিক পথের সন্ধান দেওয়ার জন্য। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآَنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ  “রমযান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।” (সূরা আল-বাকারা-১৮৫) হিদায়াতের এই কিতাব আল -কুরআন শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের উপরে ফরজ করা হয়েছে। নিম্নে আল -কুরআন শিক্ষা করার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনা করা হলোঃ

আল -কুরআন শিক্ষা করা ফরজ:

আল -কুরআনের প্রথম বাণী হচ্ছে, اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ “পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আলাক-১) এখানে ইক্বরা, অর্থ: পড়ো। এ আয়াতের মাধ্যমে প্রত্যেক মুসলিমকে আল্লাহ জানিয়ে দিলেন তোমরা জানার জন্য, বোঝার জন্য এবং সঠিকটা মেনে চলার জন্য পড়া-লেখা করো, অধ্যয়ন করো। অর্থাৎ জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানদের জন্য আল্লাহ তাআলা ফরজ করে দিয়েছেন। আর এটার বাস্তব নির্দেশ দিয়েছেন রাসূল (সা.)। আল -হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ : طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ

“হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের উপরে ফরজ।” (সূনান ইবনে মাজা)

 

জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি আল -কুরআন শিক্ষা করাও প্রত্যেক মুসলমানের উপরে আল্লাহ ফরজ করে দিয়েছেন। রাসূল (সা.) এ সম্পর্কে মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন,

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم تَعَلَّمُوا الْقُرْآنَ وَالْفَرَائِضَ وَعَلِّمُوا النَّاسَ فَإِنِّى مَقْبُوضٌ

“হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমরা কুরআন ও ফারায়েজ (উত্তারাধিকার আইন) শিক্ষা করো এবং মানুষদেরকে শিক্ষা দাও কেননা আমাকে উঠিয়ে নেওয়া হবে।” (সূনান আত-তিরমিযি)

তাই আমাদের উপরে কর্তব্য আল -কুরআন ও ইলমে ফারায়েজ (উত্তারাধিকার আইন) শিক্ষা করা এবং এর আলোকে জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্র পরিচালনা করা।

আল -কুরআন শিক্ষা করা সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত:

আল -কুরআন অধ্যয়ন করা, কুরআন জানা-বুঝার চেষ্টা করা পৃথিবীর সকল কাজের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কাজ। কারণ এ কুরআনের মধ্যে রয়েছে মানুষের জীবন পরিচালনা পদ্ধতি, হিদায়াতের সঠিক পথ। প্রত্যেক কাজ শুরু করার সময় রাসূল (সা.) বিসমিল্লাহ পড়ে (আল্লাহর নাম নিয়ে) শুরু করার কথা বলেছেন। কিন্তু কোন কাজ শুরু করার আগে ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতারিজ রাজীম’ অর্থাৎ শয়তানের কুমন্ত্রনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলেননি। তবে একটি কাজ করার আগে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা শয়তানের কুমন্ত্রনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলেছেন, সেটা হলো আল -কুরআন তিলাওয়াত বা অধ্যয়নের সময়। এ সম্পর্কে আল -কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,

فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ

 

“সুতরাং যখন তুমি কুরআন পড়বে তখন আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান হতে পানাহ চাও।” (সূরা আন-নাহল-৯৮)

আল -কুরআনের এ বক্তব্য থেকে জানা যায়, শয়তান সকল কাজে কুমন্ত্রনা দেয়, তবে কুরআন অধ্যয়নের সময় সবচেয়ে বেশী কুমন্ত্রনা দেয়। কারণ কুরআন যাতে মানুষ বুঝতে না পারে, সেজন্য শয়তান বেশী চেষ্টা করে। মুসলমানরা কুরআন থেকে দূরে সরে থাকলে শয়তান বেশী খুশি হয়। এজন্যই আল্লাহ তাআলা কুরআন অধ্যয়নের সময় শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়ার কথা বলেছেন। এজন্য আমাদের উচিৎ আল -কুরআন জানা ও বোঝার জন্য সবচেয়ে বেশী চেষ্টা করা।

আল -কুরআন হিদায়াতের একমাত্র কিতাব:

আল -কুরআন হচ্ছে বিশ্ব মানবাতার জন্য হিদায়াতের একমাত্র কিতাব। এই কুরআনই বিশ্বের সকল মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে পারে, হিদায়াতের আলোয় আলোকিত করতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّ هَذَا الْقُرْآَنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ وَيُبَشِّرُ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا كَبِيرًا (৯) وَأَنَّ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآَخِرَةِ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا

“নিশ্চয় এ কুরআন এমন একটি পথ দেখায় যা সবচেয়ে সরল এবং যে মুমিনগণ নেক আমল করে তাদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। আর যারা আখিরাতে ঈমান রাখে না আমি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছি যন্ত্রণাদায়ক আযাব।” (সূরা বনি ইসরাইল- ৯-১০)

قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُبِينٌ (১৫) يَهْدِي بِهِ اللَّهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلَامِ وَيُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِهِ وَيَهْدِيهِمْ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ

 

“অবশ্যই তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে আলো ও স্পষ্ট কিতাব এসেছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে শান্তির পথ দেখান, যারা তাঁর সন্তুষ্টির অনুসরণ করে এবং তাঁর অনুমতিতে তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করেন। আর তাদেরকে সরল পথের দিকে হিদায়াত দেন।” (সূরা আল-মায়েদা- ১৫-১৬)

আল -কুরআন ছাড়া অন্য কারো কাছে হিদায়াত অন্নেষণ করা যাবে না। কেউ এটা করলে আল্লাহ নিজে তাকে গুমরাহ করে দিবেন। এ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,

مَنِ ابْتَغَى الْهُدَى فِى غَيْرِهِ أَضَلَّهُ اللَّهُ

“যে ব্যক্তি কুরআন ছাড়া অন্য করো কাছে হিদায়াত চাইবে, আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করে দিবেন।” (সূনান আত-তিরমিযি)

অতএব, আমাদের জীবন চলার পাথ ইসলামকে সঠিকভাবে জানার জন্য হিদায়াতের একমাত্র কিতাব আল -কুরআন শিক্ষা করতে হবে।

আল -কুরআনের মধ্যে সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে:

বিশ্ব মানবতার জীবন পরিচালনার জন্য যা দরকার আল্লাহ তাআলা আল -কুরআনের মধ্যে সব দিয়ে দিয়েছেন। মানুষের জন্য এমন কিছু নাই যার প্রয়োজন আছে অথচ কুরআনে তা বলা হয়নি, বরং সব কিছুকে সাজিয়ে-গুছিয়ে পরিস্কার করে আল -কুরআনে বলে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 

وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً وَبُشْرَى لِلْمُسْلِمِينَ

“আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনা, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ।” (সূরা আন-নাহল- ৮৯)

এ কিতাব থেকে যদি কেউ তার জীবনের চলার গাইড হেসেবে সম্পূর্ণটা মেনে চলে তাহেল সে সকল ক্ষেত্রে পূর্ণতা লাভ করবে। আর যদি কিছু মানে কিছু অস্বিকার করে তাহলে সে দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,

أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاءُ مَنْ يَفْعَلُ ذَلِكَ مِنْكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدِّ الْعَذَابِ 

“তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে ঈমান রাখ আর কিছু অংশ অস্বীকার কর? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা তা করে দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ছাড়া তাদের কী প্রতিদান হতে পারে? আর কিয়ামতের দিনে তাদেরকে কঠিনতম আযাবে নিক্ষেপ করা হবে।” (সূরা আল-বাকারা- ৮৫)

তাই আমাদের উচিৎ আল -কুরআন শিক্ষা করা, কুআনের সকল বিধান সম্পর্কে অবগত হওয়া এবং জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে আল -কুরআন মেনে চলা, তাহলেই দুনিয়া ও পরকালীন জীবনে মুক্তি পাওয়া যাবে।

আল -কুরআনের আমলকারীর মর্যাদা:

আল্লাহ তাআলা রাসূল (সা.) এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত সকল বাতিল দ্বীনের উপরে দ্বীন ইসলামকে বিজয় করার জন্য। আল -কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,

هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ

“তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্যদ্বীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি সকল দ্বীনের উপর তা বিজয়ী করে দেন। যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।” (সূরা আস-সফ-৯)

আল -কুরআন বিশ্ব মানব সভ্যতার দরবারে সবচেয়ে সম্মানিত ও শ্রেষ্ঠ কিতাব। এ কিতাবের আমলকারীকে এবং কিতাবের বিধান প্রতিষ্ঠাকারীকে আল্লাহ জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং পরিবারের লোকদের জন্য জান্নাতের শুপারিশ করার অধিকার দিবেন। এ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : مَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ وَاسْتَظْهَرَهُ ، فَأَحَلَّ حَلاَلَهُ ، وَحَرَّمَ حَرَامَهُ أَدْخَلَهُ اللَّهُ بِهِ الجَنَّةَ وَشَفَّعَهُ فِي عَشَرَةٍ مِنْ أَهْلِ بَيْتِهِ كُلُّهُمْ قَدْ وَجَبَتْ لَهُ النَّارُ. 

“হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কুরআন অধ্যয়ন করবে এবং কুরআনকে প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করবে। কুরআনে বর্ণিত হালালকে হালাল হিসেবে মেনে নেবে, হারামকে হারাম হিসেবে মেনে নেবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং পরিবারের দশজনের জন্য সুপারিশ করার অধিকার দিবেন যাদের সকলের ব্যাপারে জাহান্নামের ফয়সালা হয়ে গিয়েছিলো।” (সূনান আত-তিরমিযি)

পরকালীন জীবনে জান্নাত পাওয়ার জন্য এবং আল্লাহর কাছে উচ্চ মাকাম বা (উচ্চ মর্যাদা) পাওয়ার জন্য আমাদের সকলের আল -কুরআন অধ্যয়ন করা, নিজের জীবনে মেনেচলা এবং এই দ্বীন ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা প্রয়োজন।

আল -কুরআন শিক্ষার পথ হচ্ছে জান্নাতের পথ:

আল -কুরআন শিক্ষার গুরুত্ব এতই বেশী দেওয়া হয়েছে যে, কুরআন শিক্ষার জন্য বা দ্বীন শিক্ষার জন্য যদি কেউ রাস্তায় বের হয় সে আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে গেলো। এবং যতক্ষণ সে এ কাজ থেকে ফিরে না আসলো ততক্ষণ আল্লাহর রাস্তায় থাকলো। এ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ خَرَجَ فِي طَلَبِ الْعِلْمِ كَانَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ حَتَّى يَرْجِعَ

“হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দ্বীন শিক্ষা করার জন্য বের হলো, সে আল্লাহর রাস্তায় বের হলো যতক্ষণনা সে ফিরে আসলো।” (সূনান আত-তিরমিযি)

দ্বীনের জ্ঞান অর্জনের পথ হচ্ছে জান্নাতের পথ। তাই জ্ঞান অর্জনের জন্য কোন ব্যক্তি রাস্তায় চলতে থাকলে এ পথে চলতে চলতে সে এক সময় জান্নাতের সন্ধান পেয়ে যাবে। আর এ পথে থাকা অবস্থায় যদি তার মৃত্যু হয় আল্লাহ তাকে জান্নাত দিয়ে দিবেন। এ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,

عَن أَبِي هُرَيرَةَ رضي الله عنه: أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم، قَالَ: ্রوَمَنْ سَلَكَ طَرِيقاً يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْماً، سَهَّلَ اللهُ لَهُ طَرِيقاً إِلَى الجَنَّةِগ্ধ .

“আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি এমন পথে গমন করে; যাতে সে বিদ্যা অর্জন করে, আল্লাহ তাআালা তার জন্য জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দেন।” (সহীহ মুসলিম ও তিরমিযী)

একাজন মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, আল -কুরআন শিক্ষা করার জন্য সেখানে যাওয়া প্রয়োজন যেতে হবে, যত কষ্টই হোক সে কষ্ট করতে হবে, এর পরেও আল -কুরআন শিক্ষা করতে হবে।

কুরআন বিহীন শরীর বিরান বাড়ীর মত:

আল -কুরআন এসেছে বিশ্ব মানবতার জীবনকে কুরআনের আলোয় আলোকিত করতে। সত্যের সন্ধান দেওয়ার জন্য, অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে আসার জন্য। তবে যে ব্যক্তি কুরআন অধ্যয়ন করবে না, কুরআনকে বোঝার চেষ্টা করবে না, কুরআন নিয়ে গবেষণা করবে না অর্থাৎ যে দেহের মধ্যে আল -কুরআনের আলো নেয় সেটা উজাড় বাড়ীর মত, ছাড়া বাড়ীর মত। একটা ছাড়া বাড়ীতে যেমন সাপ, বিচ্ছু, তেলাপোকা ইত্যাদি পোকা-মাকড় বসবাস করে। ঠিক তেমনি যে দেহের মধ্যে কুরআন নেই সেই দেহে শয়তান বাস করে। আল-হাদীসে এর সমর্থনে বর্নিত হয়েছে,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- ্র إِنَّ الَّذِى لَيْسَ فِى جَوْفِهِ شَىْءٌ مِنَ الْقُرْآنِ كَالْبَيْتِ الْخَرِبِ গ্ধ

“হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, যেই দেহের মধ্যে আল -কুরআনের কোন শিক্ষা নেই সেই দেহটা হচ্ছে উজাড় বাড়ীর মত।” (সূনান আত-তিরমিযি) 

তাই একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, জীবনের সকল কাজের মধ্যে সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিয়ে আল -কুরআন শিক্ষা করা, তাহলেই শয়তান থেকে নিজেকে রক্ষা করা যাবে।

আল -কুরআনের কথা সঠিক কথা:

আল্লাহ তাআলা নবী-রাসূলদেরকে পৃথিবীতে পঠিয়েছিলেন সমাজে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আর আল -কুরআন হচ্ছে সেই ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করার একমাত্র মানদ-। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ

“নিশ্চয় আমি আমার রাসূলদেরকে স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সাথে কিতাব ও (ন্যায়ের) মানদ- নাযিল করেছি, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে।” (সূরা হাদীদ-২৫)

আল -কুরআনই হচ্ছে সত্য কিতাব এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। আল্লাহ বলেন, ذَلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ “এটি (আল্ল¬াহর) কিতাব, এতে কোন সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত।” (সূরা আল-বাকারা-২) তাই সত্য কথা বলতে হলে, নেক আমল করতে হলে, ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হলে আল -কুরআন জানতে হবে, আল -কুরআন বুঝতে হবে, আল -কুরআনকে মেনে চলতে হবে, আল -কুরআন দিয়ে বিচার-ফয়সালা করতে হবে। তাহলে উত্তম প্রতিদান পাওয়া যাবে। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন,

مَنْ قَالَ بِهِ صَدَقَ وَمَنْ عَمِلَ بِهِ أُجِرَ وَمَنْ حَكَمَ بِهِ عَدَلَ وَمَنْ دَعَا إِلَيْهِ هُدِىَ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ

“কুরআন দিয়ে যে কথা বলে সে সত্য কথা বলে, কুরআন থেকে যে আমল করে সে তার প্রতিদান পাবে, কুরআন দিয়ে যে বিচার-ফয়সালা করে সে ন্যায় বিচার করে এবং যে কুরআনের দিকে মানুষকে আহবান করে সে সঠিক পথের সন্ধান পায়।” (সূনান আত-তিরমিযি)

তাই আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, আল -কুরআন শিক্ষা করে এ শিক্ষার আলোকে সমাজে সত্য প্রতিষ্ঠা করা, ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা সর্বপরি জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল -কুরআনকে মেনে চলা।

কুরআন অধ্যয়নকারীকে আল্লাহ স্বরণ করেন:

এই পৃথিবীতে সর্বোত্তম কাজ হচ্ছে আল -কুরআন অধ্যয়ন করা এবং সে অনুযায়ী জীবনে আমল করা। যারা দুনিয়ায় আল -কুরআন অধ্যয়ন করবে, জেনে-বুঝে আমল করবে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাদেরকে স্বরণ করবেন এবং এই কুরআনের সংস্পর্শে থাকার কারনে তাদের মাধ্যমে পৃথিবীতে আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে দিবেন। এ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: دَخَلْتُ عَلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرَ الْحَدِيثَ بِطُولِهِ إِلَى أَنْ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، أَوْصِنِي قَالَ: "أُوصِيكَ بِتَقْوَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ، فَإِنَّهُ أَزْيَنُ لِأَمْرِكَ كُلِّهِ " قُلْتُ: زِدْنِي قَالَ: "عَلَيْكَ بِتِلَاوَةِ الْقُرْآنِ، وَذِكْرِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ، فَإِنَّهُ ذِكْرٌ لَكَ فِي السَّمَاءِ وَنُورٌ لَكَ فِي الْأَرْضِ

“হযরত আবু যার গিফারী (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসুল (স.) এর নিকট উপস্থিত হলাম। তখন তিনি একটি লম্বা হাদীস বর্ণনা করলেন। আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আামকে কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন, আমি তোমাকে আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি। কেননা ইহা তোমার সমস্ত আমলকে সৌন্দর্যম-িত করবে। (আবু যার বলেন) আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আপনি আমাকে আরো অতিরিক্ত কিছু উপদেশ দিন। রাসূল (সা.) বললেন, তুমি কুরআন তিলাওয়াত করবে এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্বরণ করবে, তাহলে আসমানে তোমাকে স্বরণ করা হবে এবং দুনিয়ায় এটা তোমার জন্য আলোকবর্তিকা হবে।” (বায়হাকী, শুয়াবুল ঈমান)

তাই আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে আল -কুরআন অধ্যয়ন করা এবং আল -কুরআনের শিক্ষা মেনে চলা। এর মাধ্যমে পরিবার, সমাজ আলোকিত হবে এবং জাহিলিয়াতের অন্ধকার দূরীভূত হবে।

আল -কুরআনের সম্মোহনি শক্তি :

আল -কুরআন যাতে মানুষ মেনে চলতে না পারে সেজন্য প্রথম যুগ থেকেই মক্কার কাফেররা কুরাআন শ্রবণ থেকে মানুষদেরকে বিরত রাখারা চেষ্টা করতো। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَا تَسْمَعُوا لِهَذَا الْقُرْآنِ وَالْغَوْا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَغْلِبُونَ

“আর কাফিররা বলে, ‘তোমরা এ কুরআনের নির্দেশ শুন না এবং এর আবৃত্তি কালে শোরগোল সৃষ্টি কর, যেন তোমরা জয়ী হতে পার।” (সূরা হা-মীম- আস-সাজদা-২৬)

কাফেরদের বাধাঁ অতিক্রম করে মক্কার সাধারণ মানুষ আল -কুরআনের তিলাওয়াত শুনতো এবং ইসলামের দিকে ধাবিত হতো। বর্ণিত আছে একদা হযরত ওমর (রা.) বাইতুল্লাহর পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছিলেন সে সময় রাসূল (সা.) নামাজের মধ্যে কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন, তাঁর মধুর তিলাওয়াত শুনে ওমর মনে মনে ভাবছে মুহাম্মদ কি কবি হয়ে গিয়েছে নাকি? এসময় রাসূল (সা.) তিলাওয়াত করলেন, وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَاعِرٍ قَلِيلًا مَا تُؤْمِنُونَ “আর এটি কোন কবির কথা নয়। তোমরা কমই বিশ্বাস কর।” (সূরা হাক্কাহ- ৪১) 

ওমর কুরআনের এ আয়াত শুনে মনে মনে ভাবলেন মুহাম্মদ আমার মনের কথা কিভাবে জানলো, তাহলে কি মুহাম্মদ গণক? এসময় রাসূল (সা.) তিলাওয়াত করলেন, وَلَا بِقَوْلِ كَاهِنٍ قَلِيلًا مَا تَذَكَّرُونَ  “আর এটা কোন গণকের কথাও নয়। তোমরা কমই উপদেশ গ্রহণ কর।” (সূরা হাক্কাহ- ৪২)

একথা শুনে ওমর হতবাক হয়ে ভাবছে এটা কবির কথা নাই, আবার গণকের কথা নাই, তাহলে মুহাম্মদ যেটা তিলাওয়াত করছে এটা কি? এমন সময় রাসূল (সা.) তিলাওয়াত করলেন, تَنْزِيلٌ مِنْ رَبِّ الْعَالَمِينَ  “এটি জগতসমুহের রবের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত।”  (সূরা হাক্কাহ- ৪৩) এর পরেই হযরত ওমর ইসলামের আলোতে আলোকিত হয়ে রাসূল (সা.) এর কাছে এসে ইসলামে দিক্ষিত হন।

কুরআনের একটি আয়াত হলেও সেটা মানুষের কাছে পৌছে দিতে হবে:

আল -কুরআন শিক্ষা করা এবং সেটা মানুষের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া মুসলিম উম্মাহর উপরে ফরজ করে দেওয়া হয়েছে। এজন্য আল -কুরআন সঠিকভাবে অধ্যয়ন করে জানতে হবে এবং সে শিক্ষা সমাজের মানুষের কাছে পৌছে দিতে হবে। আল-হাদীসে এ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে,

وَعَن عَبدِ اللهِ بنِ عَمرِو بنِ العَاصِ رَضِيَ اللهُ عَنهُمَا: أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم، قَالَ: بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً، وَحَدِّثُوا عَنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلاَ حَرَجَ، وَمَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّداً فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ. رواه البخاري

“হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ‘আমর ইবনে ‘আস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার পক্ষ থেকে জনগণকে (আল্লাহর বিধান) পৌঁছে দাও, যদিও সেটা একটি আয়াত হয়। বনী-ইসরাইল থেকে (শিক্ষনীয় ঘটনা) বর্ণনা করতে পার, তাতে কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত-ভাবে আমার প্রতি মিথ্যা (বা জাল হাদিস) আরোপ করল, সে যেন নিজ আশ্রয় জাহান্নামে বানিয়ে নিলো।” (সহীহ আল-বুখারী)

এটার মাধ্যমে আমাদের জন্য শিক্ষা হচ্ছে আল -কুরআন জানতে হবে এবং আল -কুরআনের শিক্ষা মানুষের কাছে পৌছে দিতে হবে। দ্বীনের এই দাওয়াত আল্লাহ আমাদের উপরে ফরজ করে দিয়েছেন। আল -কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,

 وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

“আর যেন তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল হয়, যারা কল্যাণের প্রতি আহ্বান করবে, ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।” (সূরা  আলে-ইমরান-১০৪)

আল -কুরআন অমান্যকারীর পরিণতি:

ক্রুআনের আয়াত অনুধাবন করে এর থেকে শিক্ষা গ্রহন করে জীবন প্ররিচালনা করা প্রত্যেক মুসলমানের উপরে অবধারিত করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا

“তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা ভাবনা করে না? নাকি তাদের অন্তরসমূহে তালা রয়েছে?” (সূরা মুহাম্মদ-২৪) এ আয়াত আমাদেরকে বলে দিচ্ছে কুরআন অধ্যয়ন করে এর থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবন পরিচালনা করতে হবে। তাহলে কুরআনের হক আদায় হবে এবং আল্লাহ এর প্রতিদান দিবেন। আর যারা দুনিয়ার জীবনে কুরআন মেনে চলবে না, বরং কুরআনকে অবজ্ঞা করে চলবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে অন্ধ করে উঠাবেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى (১২৪) قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَى وَقَدْ كُنْتُ بَصِيرًا (১২৫)  قَالَ كَذَلِكَ أَتَتْكَ آيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا وَكَذَلِكَ الْيَوْمَ تُنْسَى

“আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য  হবে নিশ্চয় এক সংকুচিত জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামত দিবসে উঠাবো অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে, ‘হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? অথচ আমি তো ছিলাম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন’?”  (সূরা ত্বহা- ১২৪-১২৬)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন, وَمَنْ كَانَ فِي هَذِهِ أَعْمَى فَهُوَ فِي الْآخِرَةِ أَعْمَى وَأَضَلُّ سَبِيلًا “আর যে ব্যক্তি এখানে (কুরআনের অনুসরণে) অন্ধ সে আখিরাতেও অন্ধ এবং অধিকতর পথভ্রষ্ট।” (সূরা বনি ইসরাইল-৭২)

তাই একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে আল -কুরআন জানা এবং সে অনুযায়ী আমল করা তাহলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ আমাদের সাথে থাকবেন।

শেষ জামানায় কুরআনের আমল থাকবে না:

রাসূল (সা.) ভবিষ্যৎবাণী করেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে এমন একটা সময় আসবে যখন আল -কুরআনের তিলাওয়াত থাকবে কিন্তু কুরআনের আমল সমাজের মানুষের মধ্যে থাকবে না। বর্তমান বিশে^র দিকে তাকালে মনে হয় সেই সময় চলে এসেছে। এখন সারা পৃথিবীতে কুরআনের তিলাওয়াত আছে কিন্তু কুরআনের আমল নেই, কুরআনের হুকুম সমাজে বাস্তবায়ন নেই। এ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ، رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " يُوشِكُ أَنْ يَأْتِيَ عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ لَا يَبْقَى مِنَ الْإِسْلَامِ إِلَّا اسْمُهُ، وَلَا يَبْقَى مِنَ الْقُرْآنِ إِلَّا رَسْمُهُ، مَسَاجِدُهُمْ عَامِرَةٌ وَهِيَ خَرَابٌ مِنَ الْهُدَى، عُلَمَاؤُهُمْ شَرُّ مَنْ تَحْتَ أَدِيمِ السَّمَاءِ مَنْ عِنْدَهُمْ تَخْرُجُ الْفِتْنَةُ وَفِيهِمْ تَعُودُ "

“হযরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ভবীষ্যতে মানুষের সামনে এমন একটা যুগ আসবে যখন নাম ব্যতিরেকে ইসলামের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না, আল -কুরআনের আক্ষরিক তিলাওয়াত ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। তাদের মসজিদ গুলো হবে বাহ্যিক দিক দিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা হবে হেদায়াত শূণ্য। আর তাদের আলেমরা হবে আকাশের নিচে জমিনের উপরে সবচেয়ে নিকৃষ্ট। কারণ তাদের মধ্য থেকে ইসলাম/দ্বীন সম্পর্কে ফিতনা প্রকাশ পাবে। অতপর সেই ফিতনা তাদের দিকেই প্রত্যাবতন করবে।” (বায়হাকী, শুয়াবুল ঈমান অধ্যায়)

বর্তমান সময়ের মুসলামানগণ এই আল -কুরআরকে তিলাওয়াত সর্বস্ব কিতাবে পরিণত করেছি। এ কথার দ্বারা এটা মনে করার সুযোগ নেই যে, কুরআন তিলাওয়াত করা যাবে না। বরং কুরআন তিলাওয়াত করলে আপনি অবশ্যই প্রতি হরফে ১০টি করে নেকি পাবেন। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন,  مَنْ قَرَأَ الْقُرْآَنَ فَلَهُ بِكُلِّ حَرْفٍ عَشْرَ حَسَنَاتٍ “যে ব্যক্তি আল -কুরআন তিলাওয়াত করবে প্রতিটি হরফের তার জন্য রয়েছে ১০টি করে সওয়াব।” (আল-বুরহান ফি উলুমিল কুরআন)

তবে কুরআনের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সে অনুযায়ী নিজের জীবন পরিচালনা করা, পরিবার ও সমাজ পরিচালনা করাই হচ্ছে মুল উদ্দেশ্য। যদি আমি এই উদ্দেশ্য ভূলে শুধু তিলাওয়াতে ব্যস্ত থাকি অথচ আল -কুরআন সমাজে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা না করি তাহলে এটা তিলাওয়াত সর্বস্ব হিসেবে গণ্য হবে।

পরিশেষে বলা যায়, আল -কুরআনের হক হচ্ছে তাকে তিলাওয়াত করতে হবে, জানতে হবে, বুঝতে হবে, বাস্তব জীবনে কুরআনের বিধান মেনে চলতে হবে। কারণ এই আল -কুরআনই কিয়ামতের দিন আপনার-আমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে সাক্ষ্য দিবে। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, الْقُرْآنُ حُجَّةٌ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ “আল -কুরআন তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে সাক্ষ্য দিবে।” (আহকামুশ-শরীয়াহ) তাই আসুন আমরা সবাই আল -কুরআন শিক্ষা করি এবং কুরআন অনুযয়ী নিজের জীবন পরিচালনা করার চেষ্টা করি।

Source: