করোনা থেকে বাঁচতে মাস্ক পরা কি জরুরি?

নিউজ ডেস্ক আপডেট:২৯ মার্চ, ২০২০ করোনা থেকে বাঁচতে মাস্ক পরা কি জরুরি?

করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষা পেতে কেউ কেউ মাস্ক পরার ওপর অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বিপরীতে অনেকে মাস্ক পরতেই চাইছে না। এ নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ওয়েবসাইট, দ্য গার্ডিয়ান ও কোয়ার্টজ ডটকমে প্রকাশিত কিছু বক্তব্য তুলে ধরছি।

কী বলছে ডব্লিউএইচও

ডব্লিউএইচও তাদের করোনা সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তরে মাস্ক ব্যবহারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছে। সেগুলো পয়েন্ট আকারে দেওয়া হলো।

১. শুধু কোভিড-১৯-এর লক্ষণগুলো নিয়ে অসুস্থ হলে (বিশেষত কাশি) কিংবা কোভিড-১৯-এর সম্ভাব্য রোগীকে দেখাশোনা করলে মাস্ক পরুন।

২. ডিসপোজেবল (যে পণ্য ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া হয়) ফেস মাস্কগুলো একবারই ব্যবহার করা যাবে।

৩. যদি আপনি অসুস্থ না হন কিংবা অসুস্থ কাউকে দেখাশোনা না করেন, তাহলে মাস্ক পরে পণ্যটির অপচয় করছেন। বিশ্বজুড়ে মাস্কের স্বল্পতা আছে। এ কারণে ডব্লিউএইচও লোকজনকে বুঝেশুনে মাস্ক ব্যবহারের তাগিদ দিচ্ছে। মূল্যবান সম্পদের অহেতুক অপচয় এড়াতে এবং মাস্কের অপব্যবহার রোধে ডব্লিউএইচও মেডিকেল মাস্কের যৌক্তিক ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে।

৪. কোভিড-১৯ থেকে নিজেকে ও অন্যদের সুরক্ষিত করতে সবচেয়ে কার্যকর পন্থাগুলো হলো বারবার হাত পরিষ্কার করা, কাশি দেওয়ার সময় মুখ হাতের কনুইয়ের ভাঁজ দিয়ে কিংবা টিস্যু দিয়ে ঢেকে ফেলা এবং কাশি বা হাঁচি দিচ্ছে এমন লোকজনের কাছ থেকে কমপক্ষে ১ মিটার (৩ ফুট) দূরত্ব বজায় রাখা।

যা আছে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে

১. মাস্ক পরা কোনো লৌহবর্ম গ্যারান্টি নয়, যা আপনাকে অসুস্থ না হওয়ার নিশ্চয়তা দেবে। নাক ছাড়াও ভাইরাস দুই চোখ দিয়েও প্রবেশ করতে পারে। এ ছাড়া অ্যারোসোল হিসেবে পরিচিত ভাইরাসটির ক্ষুদ্র কণাগুলো মাস্ক ভেদ করে প্রবেশ করতে পারে। তবে মুখ ও নাক নিঃসৃত অতি ক্ষুদ্র জলীয় ফোঁটা (ড্রপলেট) আটকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে মাস্ক। এ ড্রপলেটই করোনাভাইরাস ছড়ানোর প্রধান একটি মাধ্যম।

২. কিছু কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, কোনো কিছু না পরার চেয়ে মাস্ক পরায় পাঁচ গুণ বেশি সুরক্ষা পাওয়া যায়। তবে অন্য কিছু গবেষণায় মাস্কের কার্যকারিতা আরও কম পাওয়া গেছে।

৩. করোনা আক্রান্ত কারো সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের আশঙ্কা থাকলে যদি আপনি মাস্ক পরেন, সেটি রোগ সংক্রমিত হওয়ার সুযোগ কমায়। যদি আপনার মধ্যে করোনাভাইরাসের লক্ষণ দেখা যায় বা আপনার করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়, সে ক্ষেত্রে আপনার মুখের মাস্ক অন্যদের সুরক্ষিত রাখতে পারে।

৪. উল্লিখিত বিষয়ের আলোকে বলা যায়, রোগীদের দেখভাল করা স্বাস্থ্য ও সামাজিক পরিচর্যাকর্মীদের জন্য মাস্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে পরিবারের এমন সদস্যদের জন্য মাস্ক দরকার, যারা অসুস্থদের পরিচর্যা করবে।

৫. আদর্শভাবে, রোগী ও রোগীর সেবা করা লোকজনের মাস্ক পরা উচিত।

কোয়ার্টজের ব্যাখ্যা

১. কোয়ার্টজ ডটকমের প্রতিবেদনের সারবত্তা হলো, মহামারী বিশেষজ্ঞরা বছরের পর গবেষণা করেও এ বিষয়ে কোনো উপসংহার টানতে পারেননি। প্রায় প্রতিটি গবেষণাতেই নমুনার ক্ষুদ্র সংখ্যা ছিল একটা সমস্যা। এ ছাড়া গবেষণার চলকগুলোও ছিল গোলমেলে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া আরভাইনের জনস্বাস্থ্যের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু নয়মার বলেন, "এটা কিছুটা রহস্যঘেরা। তবে এটাই আপনার বিজ্ঞান।”

২. এখন পর্যন্ত আমরা যে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পেরেছি, সেটি হলো ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অন্য অনেক ভাইরাসের মতো লাখ লাখ ক্ষুদ্র ভাইরাস কণার মাধ্যমে ছড়ায় করোনাভাইরাস। কেউ একজন কাশি, হাঁচি দিলে, কোনো বস্তু স্পর্শ করলে ড্রপলেটে থাকা এ কণাগুলো কোনো একটি সারফেসে (পৃষ্ঠ/উপরিভাগ) জায়গা করে নেয় অথবা কিছু সময়ের জন্য বাতাসে ভেসে থাকে। প্রতি ড্রপলেটে হাজার হাজার ক্ষুদ্র কণা থাকে। আমরা মুখে হাত দিলে এ কণাগুলো আমাদের নাক, মুখ বা চোখ দিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারে। এ ছাড়া আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির খুব কাছাকাছি থাকলে নিঃশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করতে পারে। মাত্রা যথেষ্ট হলে একটি মাত্র ড্রপলেটের মাধ্যমে ভাইরাস আমাদের দেহে পুনরুৎপাদিত হতে পারে। এটি তখন ফের সংক্রমণ চক্র শুরু করে।

৩. ভাইরাসের উল্লিখিত সংক্রমণ থেকে দৃশ্যত ন্যূনতম কিছু সুরক্ষা দেয় প্রস্তুতকৃত বিভিন্ন ধরনের মাস্ক। এ মাস্কগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতিদিন ব্যবহৃত সার্জিক্যাল মাস্ক থেকে শুরু করে এন৯৫ রেসপিরেটর। হাসপাতালগুলোতে একের পর এক গবেষণায় সুরক্ষার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।

৪. বাড়িতেও মাস্ক কাজে আসতে পারে। ডব্লিউএইচও এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ইউএস সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) পরামর্শ হলো, মাস্ক তারাই ব্যবহার করবেন, যারা আক্রান্ত এবং কোভিড-১৯ আক্রান্তদের সেবায় নিয়োজিত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তথ্যপ্রমাণ কমই পরিষ্কার।

৫. সিডিসির ২০০৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, মাস্কের ব্যবহারে রোগীর পরিচর্যাকারীদের ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা কমে ৬০-৮০ শতাংশ। কিন্তু গবেষণার সমস্যা ছিল, বাছাই করা লোকজনের মধ্যে অর্ধেকেরও কম নিয়মিত মাস্ক পরেছে। অন্য কিছু গবেষণায় দেখা যায়, বাসাবাড়িতে মাস্ক পরা কোনো ফল বয়ে আনেনি।

তথ্য বিশ্লেষণ

উল্লিখিত তথ্যগুলোর আলোকে কয়েকটি বক্তব্য দেওয়া যায়।

১. ভাইরাস সংক্রমণ রোধে মাস্কের শত ভাগ কার্যকারিতা নিয়ে মতৈক্যে পৌঁছাতে পারেননি গবেষকরা।

২. সংক্রমণের শঙ্কামুক্ত লোকজনকে প্রকারান্তরে মাস্ক ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

৩. ভাইরাসে আক্রান্ত ও আক্রান্ত ব্যক্তির পরিচর্যাকারীদের মাস্ক পরায় উৎসাহিত করা হয়েছে।

৪. মাস্কের বাইরে সচেতনতার অংশ হিসেবে হাত ধোয়া বা দূরত্ব বজায় রাখার মতো বিষয়গুলোতে জোর দেওয়া হয়েছে।

তথ্যসূত্র: ডব্লিউএইচও, দ্য গার্ডিয়ান ও কোয়ার্টজ ডটকম

Source: www.eisomoy24.com