জেনে নিন ধূমপানের ইতিহাস!

নিউজ ডেস্ক আপডেট:০১ অক্টোবর, ২০১৯ জেনে নিন ধূমপানের ইতিহাস!

প্রায় ৮০০০ বছর আগে পৃথিবীতে তামাকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। আর ৬০০০ বছর আগে থেকে মধ্য আমেরিকায় তামাকের চাষ শুরু হয়। প্রথমদিকে মূলত ঔষধ হিসাবে ব্যবহার করা হতো তামাক। তামাকের শুকনো পাতাকে তামাক বলে। এর পাতা সাধারণত ১২-১৮ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়। তামাক থেকে বিড়ি, সিগারেট, জর্দা ইত্যদি তৈরি হয়।

প্রাচীন কালেই ব্যবিলনীয় ও মিশরীয়দের মধ্যে ধূমপানের প্রচলন ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দে প্রাচীন মিশরীয়রা ‘কানাবিস’ নামক ধূমপানের প্রচলন করেছিল। যা ছিল আদতে আমাদের দেশের হুক্কার একটি রূপ। খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ শতাব্দীর দিকে মায়া সভ্যতার মানুষেরা ধূমপান এবং তামাক পাতা চিবানো শুরু করে। মায়ানরা তামাক পাতার সাথে বিভিন্ন ভেষজ এবং গাছগাছড়া যোগ করে অসুস্থ্য এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করতো। প্রাচীন গুহাচিত্র থেকে জানা যায় মায়ান পুরোহিতরা ধূমপান করতো এবং এটা তাদের কাছে বিশেষ অর্থ বহন করতো। তাদের বিশ্বাস ছিলো ধূমপানের মাধ্যমে আত্মাদের সাথে যোগাযোগ করা যায়। পরবর্তীতে মায়ানরা পুরা আমেরিকায় ছড়িয়ে যায় এবং সেই সাথে তামাক গাছকে ও ছড়িয়ে দেয় আমেরিকা জুড়ে।

ইউরোপিয়ানদের মধ্যে বিখ্যাত নাবিক এবং আবিষ্কারক ক্রিস্টোফার কলম্বাস প্রথম তামাক গাছ দেখেন ১৪৪২ সালে কলম্বাস যখন সান সাল্ভাদরে গিয়ে পৌঁছান তখন সেখানকার আদিবাসীরা মনে করেছিল কলম্বাস ঈশ্বর প্রেরিত স্বর্গীয় জীব। তারা কলম্বাসকে উপহার স্বরূপ কাঠের তৈরি যুদ্ধাস্ত্র, বন্য ফলমূল এবং শুকনো তামাক পাতা দিয়েছিল। অন্যান্য উপহারগুলো নিলেও কলম্বাস ধূমপান না করে তামাক পাতাগুলো ফেলে দিয়েছিলেন।

ইউরোপিয়ানদের মধ্যে প্রথম ধূমপান করে রদ্রিগো ডি যেরেয। তিনি ছিলেন স্পেনের নাগরিক। ১৪৪২ সালে রদ্রিগো ডি কিউবায় যান। পরবর্তীতে স্পেনে ফিরে গিয়ে তিনি জনসম্মুখে ধূমপান করে মানুষকে চমকে দিতেন। একজন মানুষের নাক এবং মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে এটা দেখে সাধারণ মানুষ ভড়কে যেত। অনেকেই ভাবতে শুরু করে যে রদ্রিগো ডি যেরেযর উপর শয়তান ভর করেছে। তাই রদ্রিগোকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১৫৩০ সালের দিকে ইউরোপিয়ানরা ক্যরিবিয়ান অঞ্চলে বৃহৎ আকারে তামাক চাষ শুরু করে। উৎপাদিত তামাক নিয়ে যাওয়া হতো ইউরোপে।

মনাদেস নামের একজন স্প্যানিশ ডাক্তার বিশ্বাস করতেন যে ধূমপান ৩৬ ধরনের অসুখ নিরাময় করে। যেমনঃ দাঁতের ব্যথা, নখের প্রদাহ, জ্বর এমনকি ক্যান্সার। যদিও এটা শুধুই ছিল তার একান্ত বিশ্বাস।

১৮৬৫ সালে ওয়াশিংটন ডিউক নামে আমেরিকার এক ব্যক্তি প্রথম হাতে তৈরি সিগারেট উদ্ভাবন করে। পরে ১৮৮৩ সালে জেমস বনস্যাক নামে আর এক আমেরিকান সিগারেট তৈরির যন্ত্র উদ্ভাবন করে। যা থেকে দিনে প্রায় এক হাজার সিগারেট তৈরি করা যেত।মোগল চিত্রকলা অনুয়াযী ভারতীয় উপমহাদেশে ধূমপানের প্রচলন ঘটান মোগলরা । উপমহাদেশে নবাবি ঘরনার আভিজ্যাতের প্রতীক হয়ে উটেছিল সুগন্ধি তামাক সেবন । পরবর্তী সময় হুক্কা ও ছিলিমের সাহায্যেও ধূমপান করা হত। তামাকের সাহায্যে ধূমপানকে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দেয় ইউরোপিয়ানরা।

প্রথম দিকে শুধু পুরুষরাই ধূমপান করলেও ধীরে ধীরে নারীরা ও আকৃষ্ট হয়। ১৯২৫ সালের দিকে সিগারেট প্রস্তুতকারকরা ব্যবসা বাড়ানোর জন্য নতুন ভোক্তা খুঁজতে শুরু করে। বিজ্ঞাপন ও হলিউডের সিনেমার মাধ্যমে তারা নারীদেরকে সিগারেটের প্রতি আকৃষ্ট করে। জনপ্রিয়তা বাড়ায় সাথে সাথে একটা প্রজন্ম সিগারেটে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুধের সময় সৈন্যরা এত বেশি ধূমপান করতো যে যুক্তরাষ্ট্রে এবং ব্রিটেনে তামাক সংকট দেখা দিয়েছিলো। এজন্য ঐ সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট তামাককে সংরক্ষিত শস্য ঘোষণা করেন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটেন সিগারেটের উপর ৪৩% ট্যাক্স বৃদ্ধি করে। ফলে ১৪% ব্রিটিশ নাগরিক ধূমপান ছেড়ে দেয়। ১৯৫০ সালের দিকে প্রথম সিগারেটের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে প্রচারনা শুরু হয়। ডঃ ওয়ান্ডার ও ডঃ গ্রাহাম একটি গবেষণায় দেখান যে, ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত ৯৫% মানুষই ২৫ বছর বা তার বেশি সময় ধরে ধূমপানে আসক্ত। প্রথম ধূমপান আসক্তি দূর করার জন্য ক্লিনিক খোলেন স্যালফোড নামের এক ব্যাক্তি (১৯৫৮ সালে)। ১৯৬৪ সালে রেডিও টিভি তে সিগারেটর প্রচারণা নিষিদ্ধ করা হয়। এ ছাড়া সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে সচেতনতামূলক কথা লেখা বাধ্যতামূলক করা হয়।১৯৬৮ সালে লেটুস পাতা দিয়ে তৈরি এক প্রকার সিগারেটে আবিষ্কার করা হয়। কিন্তু তা জনপ্রিয়তা লাভে ব্যর্থ হয়। ১৯৭১ সালে ইউরোপ ও আমেরিকায় গণপরিবহন এবং সিনেমা হলে ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়। এভাবেই ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ধূমপান রোধ করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করে। আমাদের দেশেও প্রকাশ্য ধূমপান না করার জন্য আইন আছে। কিন্তু সেই আইন এখন পর্যন্ত কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।

ধূমপানের স্বাস্থ্য ঝুঁকি
তামাকের মধ্যে নিকোটিন নামক এক প্রকার বিষাক্ত পদার্থ রয়েছে যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়। যারা ধূমপান করে তাদের আঙ্গুলের ফাঁকে, ঠোঁটে, জিভের ডগায় এবং দাঁতের মাড়িতে যে এক ধরনের কালচে দাগ দেখা যায় তা নিকোটনের প্রভাব। ধূমপানের ফলে ধোয়ার সাথে এই নিকোটিন মানুষের শ্বাসনালী দিয়ে প্রথমে ফুসফুসে যায় এবং পরে তা রক্তের সাথে মিশে সারাদেহে ছড়িয়ে পড়ে এবং কিছু অংশ বের হয়ে আসা ধোয়ার সাথে বেরিয়ে আসে। এর ফলে খুব ধীরে ধীরে ধূমপায়ীদের ফুসফুসের ভিতর নিকোটিন জমতে থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, ধূমপানের প্রতিটি টানের সময় কয়েক সেকেন্ডের জন্য ফুসফুস অকেজোঁ হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয় তারা আরও বলেন-যদি একই সাথে ২০টি সিগারেটের নিকোটিন মানবদেহে প্রবেশ করে তবে তার মৃত্যু অনিবার্য। তবে নিকোটিনের প্রভাব মানুষের দেহে খুব ধীরে ধীরে কাজ করে বলে প্রতিক্রিয়াও হয় ধীরে ধীরে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়-ক্যান্সার, যক্ষ্মা, ব্রংকাইটিস ইত্যাদি রোগের প্রধান কারণ ধূমপান। প্রতিবারে ধূমপানে মানুষের আয়ু কমে যায় পাঁচ মিনিট।

ধূমপান যেমন ব্যক্তি জীবনের জন্য ক্ষতিকর তেমনি জাতীয় জীবনের জন্যও ক্ষতিকর। ব্যক্তি জীবনে ধূমপানের প্রভাবে নেশাগ্রস্ত হয়, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, যক্ষ্মা, ব্রংকাইটিস, গ্যাস্টিক, আলসার, হৃদরোগ প্রভৃতি মারাত্মক রোগ হয়। ধূমপান জাতীয় জীবনেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। যত্রতত্র ধূমপান অধূমপায়ীদের জন্যও স্বাস্থ্যগত ক্ষতির কারণ হয়। খালি সিগারেটের প্যাকেট, দিয়াশলাইয়ের কাঠি যত্রতত্র ফেলে পরিবেশও নোংরা করা হচ্ছে। তাছাড়া একটি অসতর্ক সিগারেটের অবশিষ্টাংশের আগুন থেকে ঘটে যেতে পারে বিশাল অগ্নিকান্ড। বায়ু দূষণের জন্যও ধূমপান অনেকখানি দায়ী। ধূমপানে আসক্ত হয়ে পড়ার কারণে মানুষের কর্মক্ষমতা কমে যায় ফলে জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রধানত মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিই ধূমপান প্রতিরোধ করতে পারে। সেজন্য প্রচার মাধ্যমে, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, পোস্টার, লিফলেট, ধূমপান বিরোধী নাটিকা ইত্যাদি বিশেষ অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারে।

ধূমপান বিষপান একথা জেনেও মানুষ সহজে এ অভ্যাস ত্যাগ করতে পারে না। বেকারত্ব কিংবা কোনো কোনো দেশের জাতীয় আয়ের বিরাট অংশের সাথে জড়িত সিগারেট ফ্যাক্টরিগুলো। জাতীয় আয় ও বেকারত্ব দূরীকরণে ব্যবস্থা গ্রহণ করে সিগারেট ফ্যাক্টরিগুলো বন্ধ না করতে পারলে শুধু উপদেশে ধূমপান বন্ধ হবে না। এর জন্যও প্রয়োজন উদ্যোগ, সচেতনতা ও সর্বাত্মক প্রচেষ্টা।

ধূমপান ত্যাগের উপায় 
মানুষ অভ্যাসের দাস। আর অভ্যাসটা যদি হয় ধূমপান তাহলে তো কথাই নেই। যেকোনো অভ্যাস ত্যাগ করতে প্রথম কয়েকটা দিন সবচেয়ে কঠিন। ধূমপান ত্যাগ করার ক্ষেত্রে এই কঠিন সময়টি পার করার কয়েকটি সহজ উপায় জানিয়েছে জীবনধারা বিষয়ক ওয়েবসাইট রিডার্স ডাইজেস্ট।

১. গোলমরিচ
ধূমপানের নেশা দূর করতে গোলমোরিচের কোনো বিকল্প নেই। গোলমরিচ খেলে শরীরের ভেতরে এমন কিছু পরিবর্তন হতে শুরু করে যার প্রভাবে একদিকে যেমন ধূমপানের ইচ্ছে কমে, তেমনি ধূমপানের ফলে শরীরের যা যা ক্ষতি হয়েছে, তার প্রভাবও কমতে শুরু করে। ফলে কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা যায় কমে।

২. এলাচ
সিগারেট খাওয়ার ইচ্ছা কমাতে এই প্রকৃতিক উপাদানটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। যখন ধূমপান করতে ইচ্ছে হবে, তখন দুই থেকে তিনটি এলাচ মুখে নেবেন। দেখবেন নিমেষে ধূমপানের ইচ্ছে চলে যাবে, সেই সঙ্গে শরীরও চাঙ্গা হয়ে উঠবে।

৩. পানি
দীর্ঘদিন ধরে সিগারেট খেলে আমাদের শরীরের ভেতর পর্যন্ত মিশে যায় নিকোটিন। যে কারণে ধূমপান ছাড়তে এতটা কষ্ট হয়। এক্ষেত্রে পানি অনেক কাজে আসে। শরীরে টক্সিন হিসেবে জমতে থাকা নিকোটিনকে ধুয়ে বার করে দিতে পানির কোনো বিকল্প নেই বললেই চলে। শুধু তাই নয়, তামাক এবং নিকোটিনের নানা ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শরীরকে বাঁচাতেও পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৪. মধু
এতে উপস্থিত বেশ কিছু ভিটামিন, এনজাইম এবং প্রোটিন শরীর থেকে নিকোটিন বের করে দেওয়ার পাশাপাশি সিগারেট খাওয়ার ইচ্ছাকেও নিয়ন্ত্রণে রাখে। ফলে ধূমপান ছাড়তে কোনো অসুবিধাই হয় না।

৫. আদা
আপনি কি ধূমপান ছাড়তে চান? তাহলে আজ থেকেই আদার সাহায্য নিন। আসলে এতে উপস্থিত বেশ কিছু উপাদান নানাভাবে সিগারেট খাওয়ার ইচ্ছা কমায়। সেই সঙ্গে ধূমপান ছাড়ার কারণে যেসব উইথড্রল সিম্পটন দেখা দেয়, সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতেও বিশেষ ভূমিকা নেয়। ফলে সিগারেট খাওয়ার প্রবণতা কমে। এক্ষেত্রে আদা চা বা কাঁচা আদা খেতে হবে। তবেই মিলবে উপকার।

৬. ওটস
সিগারেটের নেশা ছাড়াতে ওটস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দুই কাপ ফোটানো পানির সঙ্গে এক চামচ ওটস মিশিয়ে সারা রাত রেখে দিন। পরদিন সকালে পানিটি পুনরায় ১০ মিনিট ফুটিয়ে নিয়ে প্রতিটি খাবারের পর অল্প করে খেতে থাকুন। এমনটা করলে দেখবেন শরীর থেকে নিকোটিন বেরিয়ে যাবে। সেই সঙ্গে কমে যাবে সিগারেট খাওয়ার ইচ্ছাও।

৭. ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট
প্রতিদিন ভিটামিন- এ, সি এবং ই সমৃদ্ধ ক্যাপসুল অথবা খাবার খেলে সিগারেটের নেশা একেবারে চলে য়ায়। সেই সঙ্গে আরও বিভিন্ন রোগের প্রকোপ কমে।

৮. মুলা
এক গ্লাস মুলার রসের সঙ্গে পরিমাণ মতো মধু মিশিয়ে দিনে দুবার করে খেলে ধূমপানের ইচ্ছা একেবারে কমে যায়।

Source: www.eisomoy24.com

করোনা ভাইরাস - লাইভ আপডেট

# দেশ আক্রান্ত মৃত সুস্থ